ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষও নাগরিক: প্রশ্ন নিরাপত্তা ও মর্যাদার
“সমকামীরা কি মানুষ নয়?
তাদের কি বাঁচার অধিকার নেই?
রাষ্ট্রে সকল যৌন পরিচয়ের মানুষদের নিজস্ব পরিচয়কে ধারণ করে স্বাধীনভাবে জীবনধারণের অধিকার রয়েছে।”
ভালোবাসা কোন অপরাধ নয়। যৌনতার ভিন্নতাও খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। এটি একজন মানুষের অধিকার। রাষ্ট্র ও সমাজে সমকামী, উভকামী, গে, লেসবিয়ান সহ সকল যৌন পরিচয়ের মানুষদের নিজের জীবনকে উপছরছা চর্চার অধিকার রয়েছে। এটিকে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা কিংবা প্রয়াস চালানো অন্যায়। মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
এই দেশে সকল লিঙ্গের মানুষ নিজেদের পূর্ণ অধিকার নিয়ে নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করবে। কেউ যেন তাঁর যৌনতা, পোশাক ও স্বাধীনতায় বাধাগ্রস্ত না হয়। আমি কাকে ভালোবাসবো, কোন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষকে ভালোবাসবো এটি আমার অধিকার। রাজধানী ঢাকার টিএসসিতে দাঁড়িয়ে উপরের কথাগুলো একজন সমকামী যুবক অসীম সাহসের সঙ্গে নিজস্ব পোশাকে রাষ্ট্র এবং এর বিশাল ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে বলছিলেন।
’১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও, দেশের মৌলবাদী, ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কাছে জিম্নি। ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষ, ভিন্ন মত, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষদের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক ধরণের অবদমন ও পীড়নের শিকার হতে হয়। এবং এসব সংঘবদ্ধ বুলিং ও কটাক্ষ একটি সুনির্দিষ্ট মৌলবাদী, উগ্রবাদী গোষ্ঠীদের পক্ষ থেকে। ভিন্ন মত ও ভিন্ন দর্শনের মানুষ আজও পরাধীন। বিশেষ করে এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এমনকি মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় পারিবারিকভাবেই শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে এ মানুষেরা নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন।
মানুষের ভালোবাসার কোনো সীমারেখা হয় না। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার কখনো ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং একজন মানুষ কাকে ভালোবাসবে এর যৌনতা নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার রাখে না।
সম্প্রতি মৌলবাদী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুল ইসলামের একটি যৌনতা-সংক্রান্ত বিষয় মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় তোলে। তিনি বিভিন্ন ইফতার মাহফিলে নাবালক ছেলেদের ঠোঁটে চুম্বন করছেন—এমন একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছিল। যেখানে সাইবার বুলিং এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হচ্ছিলো জামায়াতে ইসলামির আমিরের পুরুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ আছে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, আছে। যদি থেকেও থাকে এতে দোষের কি?
নাবালকের প্রতি যৌন আকর্ষণ ও যৌনাচার আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু সমলিঙ্গের প্রাপ্তবয়স্ক কারো প্রতি সম্পর্ক এবং আকর্ষণ কোনভাবেই দন্ডনীয় অপরাধ হতে পারে না। প্রাপ্তবয়স্ক একজন নারী ও পুরুষ যে কোন লিঙ্ক পরিচয়ের মানুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করা ও এর চর্চার অধিকার রাখেন।
বাংলাদেশের আইনও নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণ করছে, শুধুমাত্র ধর্মান্ধ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর চাপে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ বছর অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমন আইন রাষ্ট্রের অবশ্যই বাতিল করে দেশের প্রতিটি লিঙ্গ ও ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।
ধর্ম কখনো মানুষের অধিকার চর্চায় বাঁধা হতে পারে না। শুধুমাত্র মৌলবাদ ও উগ্রবাদ ধর্মের নামে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের মানুষদের জীবনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায়। নিজেদের আইন কানুন অন্যদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়। এটি অন্যায়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের উচিত রাষ্ট্র সকল যৌন পরিচয়ের মানুষদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। যাতে করে রাষ্ট্রের একজন নাগরিক কোন ক্ষেত্রেই ধর্মের দোহাই কিংবা মৌলবাদের আক্রোশের শিকার না হয়। সে যেন তাঁর অধিকারকে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করতে পারে।
