গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ও মৌলবাদের আশঙ্কা (পর্ব-১)
দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন হয় স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার ভারতে পলায়নের মধ্য দিয়ে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পথ ধরে এক দফার সরকার পতনের আন্দোলন রূপ নেয় একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানে। গণতন্ত্রের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দলগুলো যে যার অবস্থান থেকে ছাত্রজনতার পাশে দাঁড়ায়। সে সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, লন্ডন থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিএনপি-সহ সকল অঙ্গসংগঠনের সকল নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে অবস্থান নিতে। সেদিন দেশের সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী এবং মুক্তিকামী সকল জনগণ যে যার অবস্থান থেকে রাজপথে নেমে আসে। অবশেষে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় হয় গণতন্ত্রের।
কিন্তু গণতন্ত্রের এমন মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয় মৌলবাদের উত্থানকে কেন্দ্র করে। নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতাকর্মীরা ৫ আগস্টের পর সারাদেশের কারাগারগুলো থেকে একযোগে জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে যায়। ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সময়ের ব্যবধানে কালো কলেমা-খচিত পতাকা হাতে শরিয়াহ আইনের শাসন ও বাস্তবায়নের দাবিতে মিছিল দেখা যায়।
জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিশ, চরমোনাই এবং হেফাজতে ইসলাম-সহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা চোখে পড়ে। কিন্তু বিএনপি দেশের একটি বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হয়েও এসব বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করে।
বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, জামায়াতের মতো মৌলবাদী, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রলোভনে বিএনপির সন্ধি এবং প্রগাঢ় সম্পর্ক। এসব ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী শুধুমাত্র ধর্মকে ব্যবহার করে মৌলবাদের মধ্য দিয়ে সহিংসতাকে উসকে দেয়।
২০০১–২০০৬ সালে বিএনপির অতীত ইতিহাসে দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের সম্পৃক্ততার বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সেসব পুরোনো স্মৃতির পর নতুন করে সন্ধি প্রশ্নের উদ্রেক করে—আগামীর বাংলাদেশ মৌলবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে কি না?
দ্বীন ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু ইসলামের শরিয়াহ আইন ভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্ম ও ভিন্ন গোত্র-পরিচয়ের মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৈধতা পেতে পারে না। কোনো ধর্মের বিধান রাষ্ট্রের আইন হতে পারে না।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থা একান্নবর্তী। এখানে মৌলবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা ও ভয়ের সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে জীবনব্যবস্থা আবর্তিত। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আইনের নিয়মকানুনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এ ধরনের ভয়ঙ্কর ব্যাধিকে অনুমোদন দিয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে ৮ বছরের স্কুলছাত্রী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যা করে ঘাতক। এতে সারাদেশজুড়ে ধর্ষকের ফাঁসির দাবিতে প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ধর্ষণের মতো এ ধরনের যৌন অপরাধ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই অপরাধবোধে জাতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা অনুভব করে প্রবলভাবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং রামিসার পরিবারের কাছে ছুতে যান। এবং ধর্ষকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু এমন ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনার পর ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনৈতিক দল হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক মন্তব্য করেন, মেয়েদের প্রথম ঋতুচক্রের পরই বিয়ে দেওয়া হলে আর শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটবে না। এ ধরনের নৈতিকতা বিবর্জিত মন্তব্য বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বর্তমান বিধিব্যবস্থায়ও যে এ ধরনের বর্বর, উগ্রবাদী ও মৌলবাদী ধর্মীয় ফতোয়াবাদী আলেমদের নগ্ন আধিপত্য রয়েছে, এটি লজ্জার। এটি সমর্থনযোগ্য নয়।
একটি শিশুর মানসিক পরিপক্বতা, শিক্ষা, স্বনির্ভরতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং শারীরিক স্বাস্থ্য বিবেচনা না করে শুধুমাত্র ধর্মের ব্যাখ্যায় এ ধরনের মন্তব্য মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত এ ধরনের ইসলামিক আলেমদের মানসিক ও শারীরিক নগ্নতাকেই প্রকাশ করে।
এ ধরনের পাশবিক মন্তব্য শিশু ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতার মানসিকতাকেই সামনে আনে। যার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় দাঁড়ি-টুপি-ওয়ালা মোল্লাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের প্রতি যে যৌন লালসা, সেটিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। একই সঙ্গে এটি শিশুদের মানুষ হিসেবে নয়, প্রজননক্ষম শরীর হিসেবে দেখার মানুষিকতাকে প্রকাশ করে।
শিশু ধর্ষণের সমাধান শিশুদের বিয়ে দেওয়া নয়; সমাধান হলো ধর্ষকদের থামানো। এবং এটি ইসলামের নামে কোনো ব্যাখ্যা কিংবা কথিত যেসব শাস্তির ব্যবস্থা আছে, সেসবের মাধ্যমে নয়। রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এটি স্পষ্ট, রাষ্ট্রে যদি মৌলবাদের বিস্তার ঘটে, সেক্ষেত্রে ধর্মের এমন সব আইন চাপিয়ে দেওয়া হবে। শরিয়াহ আইনের নামে ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও যৌন পরিচয়ের মানুষদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটবে, যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রত্যাশিত নয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির সরকার গঠনের পর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থে জামায়াতে ইসলামী-সহ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এবং এসব ইসলামপন্থী দল সারাদেশে টার্গেট করে আগামীতে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নের মিশনে নেমেছে, যা আগামী বাংলাদেশকে একটি সংকটে ফেলবে। এবং আল্লামা মানুনুল হকদের মত ধর্মীয় বিকারগ্রস্থ ও অবসাদগ্রস্থ মানুষের রাষ্ট্র ক্ষমতার প্যারালালে নিয়ে আসবে। যা জনজীবনের সঙ্কট ও সমস্যাকে আরো দীর্ঘায়িত করবে। এ সকল ধর্মের বাঁদরেরা জাতীয় সমস্যা হিসেবে ঝেঁকে বসবে।
