গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ: প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও উদ্বেগ
গণতন্ত্রের বিপরীতে চেপে বসা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ কায়েম করে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশের মানুষ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে একদলীয় সরকারব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। সারাদেশে বিরোধী মত দমন, কারচুপির নির্বাচন, গুম, খুন ও হত্যাযজ্ঞের একটি রাজনৈতিক দুঃশাসন ও অপশাসনের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষকে যেতে হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে শৃঙ্খলমুক্তির গান গেয়েছে এ দেশের ছাত্রজনতা। স্বৈরিণী শেখ হাসিনা প্রবল প্রতিবাদের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরল। একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধর্মীয়, রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার খবর গভীরভাবে উদ্বেগজনক। হিন্দু, আহমদিয়া, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল নাগরিকের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে নির্যাতনের শিকার হতে পারে না।
কিন্তু আমরা কী দেখছি?
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর কার্যত সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। শান্তির ধর্ম ইসলামের ধর্মীয় অপব্যাখ্যার ফাঁদে এ দেশের একটি শ্রেণি সংঘাত, সহিংসতা, উগ্রবাদ, চরমপন্থা এবং মৌলবাদী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ধর্মকে ব্যবহার করে দেশে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার উত্থান ঘটেছে বেশ আকস্মিকভাবেই। যারা ভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষদের হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে এবং সহিংস হয়ে উঠছে।
ভিন্ন মতাদর্শ, ভিন্ন ধর্ম কিংবা কট্টরপন্থায় যুক্ত হয়ে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করে কি বেহেশতে যাওয়া যায়?
সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৩২ আয়াতে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল—যদি না সে হত্যার বদলে হত্যা করে কিংবা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে—তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।”
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা, উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও সহিংসতা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। এবং এর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।
কিন্তু দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে এসবের বিরুদ্ধে নীরব ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। এবং গত ১২ই ফেব্রুয়ারি দেশের জাতীয় নির্বাচনের পর ২০০১–২০০৬ সালের মতো মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামীকেই বিরোধী দল বানিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলাসহ ২১শে আগস্টের মতো গ্রেনেড হামলার মর্মান্তিক ইতিহাস রয়েছে। যেখানে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন মামলার চার্জশিটে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে উঠে আসে। এবং বর্তমানে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা মৌলবাদী দল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধেও সরাসরি অভিযোগ উঠে জঙ্গিবাদ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেনেড হামলার সঙ্গে সংযুক্ততার।
আমি একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ইসলাম ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মানব মর্যাদা রক্ষার শিক্ষা দেয়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সকল ধর্ম ও মতের, সকল লিঙ্গের মানুষ সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। এই দীর্ঘ দেড় দশক পরে এসেও বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নতুন করে জামায়াত-সংশ্লিষ্টতা এবং সারাদেশে নতুন করে জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থার বিস্তার ব্যক্তি তারেক রহমানের জঙ্গিবাদের প্রতি মনস্তাত্ত্বিকভাবে আগ্রহের দিকটিই প্রকাশ করে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পরিস্থিতি একটি গভীর উদ্বেগের কারণ।
