ধর্ম বিশ্বাসের জায়গায়, রাষ্ট্র চলুক গণতন্ত্রের পথে
বাংলাদেশ কখনোই মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থার অভয়ারণ্যে পরিণত হবে না। একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, ইসলাম শান্তি, সহনশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মের অপব্যাখ্যা করে সহিংসতা বা বিভাজনের রাজনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্পকর্ম, দেয়ালচিত্র ও ভাস্কর্য ভাঙচুর, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও সম্পত্তিতে হামলা এবং ভিন্নমতের মানুষের ওপর ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরির মতো ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়; বরং বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং সামাজিক সহাবস্থানের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। যে কোনো সহিংসতা বা ধর্মীয় উসকানির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সমান ও দৃশ্যমান অবস্থান জরুরি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় অবস্থিত সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের নারী অবয়বের মাথায় কালো কাপড় (কালো হিজাবসদৃশ কাপড়) পরিয়ে দেওয়ার ঘটনা, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের দেয়ালে জুলাই আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আঁকা দেয়ালচিত্র ও গ্রাফিতি কালো রঙ ছড়িয়ে মুছে ফেলা বা বিকৃত করার ঘটনাগুলো উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ও সমঝোতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যখন কোনো মূলধারার দল বিএনপি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তখন অনেক নাগরিকের মধ্যে আশঙ্কা জন্ম নেয়—রাষ্ট্র কি আদর্শিকভাবে আরও রক্ষণশীল বা অসহিষ্ণু পথে এগোচ্ছে? বিশেষ করে, বিগত জোট সরকারের আমলে বিএনপির বিরুদ্ধে সারাদেশে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং জঙ্গি হামলার দগদগে স্মৃতি এখনো মানুষের মনে বিদ্যমান।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জোট গঠন বৈধ হলেও, তা যেন কখনো উগ্রবাদকে বৈধতা দেওয়ার উপলক্ষ না হয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে, জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সহিংসতার মূল্য দেশকে বহুবার দিতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো—ধর্মকে রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার হতে না দেওয়া। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করাই হতে পারে একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ বাংলাদেশের ভিত্তি।
আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে ধর্ম থাকবে ব্যক্তির বিশ্বাসের জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সংবিধান, আইনের শাসন এবং সকল নাগরিকের সমান মর্যাদার নীতিতে? সেই উত্তরই আগামী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্র ক্ষমতায় আবারও সেই বিএনপি ও জামায়াত। রাজনৈতিক সন্ধির বিষয়টিও বেশ আলোচনায় রয়েছে। সেখানে জঙ্গিবাদ নতুন করে ফিরে এলে অবাক হওয়ার মতো কিছুই ঘটবে না—এমন আশঙ্কাও অনেকে প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক অতীত ইতিহাস সেই শঙ্কার ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রের উত্তরণের এই অভিযাত্রায় প্রত্যাশা থাকবে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সেই পথে এগোবে না এবং ব্যক্তি তারেক রহমানও নিজের বিরুদ্ধে থাকা জঙ্গিবাদ-সম্পৃক্ততার অতীত অভিযোগ থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও দায়িত্বশীল রাজনীতির পথে এগিয়ে যাবেন।
